Tuesday, July 23, 2024
প্রচ্ছদবাণিজ্যউদ্যোক্তানারী উদ্যোক্তা কাকলী খান, 'শুদ্ধ কৃষি'

নারী উদ্যোক্তা কাকলী খান, ‘শুদ্ধ কৃষি’

Published on

প্রায় ১১ বছর ধরে কাকলি খানের বাসায় বাজারের রাসায়নিক মিশ্রিত ভেজাল খাবারের প্রবেশ নিষিদ্ধ। ভেজাল খাবারকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখানো সম্ভব হচ্ছে তাঁর উদ্যোগ ‘শুদ্ধ কৃষি’র জন্য। আর এই উদ্যোগের জন্য সম্প্রতি বাংলাদেশ ওপেন নেটওয়ার্ক সোর্সের উদ্যোক্তা কার্যক্রম চাকরি খুঁজব না, চাকরি দেব প্ল্যাটফর্ম ও ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির ইনোভেশন অ্যান্ড এন্ট্রাপ্রেনিরশিপ বিভাগের যৌথ আয়োজনে উদ্যোক্তা সম্মাননা ২০১৮ পেয়েছেন।

শুদ্ধ কৃষি, একটি কৃষি উদ্যোগ। উদ্যোক্তা কাকলী খান। বিডিওএসএন এর উদ্যোক্তা গ্রুপ ‘চাকরি খুঁজবো না, চাকরি দেবো’ প্ল্যাটফর্ম থেকে তিনি এবছর উদ্যোক্তা পুরস্কার পেয়েছেন। কাকলীর শুদ্ধ কৃষি উদ্যোগের শুরুটা হয় পরিবারের সদস্যদের জন্য রাসায়নিক ও বিষমুক্ত খাবার সংগ্রহের তীব্র তাগাদা থেকে। প্রায় আটবছর আগে কিডনিজনিত রোগে কাকলীর ফুপু মারা যান। সেসময় চিকিৎসক জানিয়েছিলেন কিডনি রোগসহ আমাদের আরো অনেক রোগের প্রত্যক্ষ কারণ খাবারে রাসায়নিক উপাদানের উপস্থিতি। বিষয়টি প্রবলভাবে কাকলীর মাথায় ঢুকে যায়। এরপর থেকে নিজ এলাকা কুষ্টিয়ার পরিচিত কৃষক যারা জৈব সার ব্যবহার করে ফসল উৎপাদন করেন তাদের কাছ থেকে নিজ পরিবারের জন্য খাদ্য পণ্য সংগ্রহ করতে শুরু করেন।

নিয়মিত এভাবেই চলতে থাকলে উদ্যোগটা আত্মীয় ও পরিচিতজনদের কাছ থেকে প্রশংসা পায়। একপর্যায়ে পরিচিতজনরা তাদের জন্যেও অর্গানিক খাদ্যপণ্য সংগ্রহ করে দেয়ার আবদার করতে থাকেন। সেই আবদারের ফলাফলই আজকের শুদ্ধ কৃষি। তবে উদ্যোগ শুরু করলেই তো আর হলো না! কাজটা এগিয়ে নিতে হবে। কিন্তু কেমনে করবে, কাকলী শুদ্ধ কৃষির ওয়ান ম্যান আর্মি! লোকবল নেই। সচরাচর প্রতিটা উদ্যোক্তার ক্ষেত্রে যা হয় আর কী! তবে উদ্যোম আর নিষ্ঠা থাকলে শেষমেশ সবই সম্ভব। তাইতো চলার পথে সহযোগি হিসেবে শুভাকাঙ্ক্ষীরা নানাভাবে এগিয়ে এসেছে। আমাকে পারতেই হবে এই আত্মবিশ্বাসে ভর করে কাকলী সারাদেশ ছুটে বেড়িয়েছে-এখনো বেড়ায়, খুঁজে বের করেছে জৈব পদ্ধতিতে চাষাবাদ করা কৃষকদের, এমনকি বাড়ির উঠানে সবজি চাষ করা গ্রামীন নারীদেরও।

উঠোনে চাষ করা সবজির মাধ্যমে নিজেদের প্রয়োজন মিটিয়ে বাকীটা শুদ্ধ কৃষি আউটলেটে সরবরাহ করে প্রচুর নারী নিজেদের হাতখরচের টাকা জোগাড় করতে সমর্থ হয়েছে। শুদ্ধ কৃষি উদ্যোগের একেবারে শুরুতে কাকলী সিদ্ধান্ত নেন তিনি নিজেই অর্গানিক কৃষিপণ্য উৎপাদন করবেন এবং ভোক্তাদের কাছে সরবরাহ করবেন। এই ভাবনা থেকেই কুষ্টিয়ায় এক আত্মীয়ের গ্রামে খামার করেছিলেন কাকলী তবে বছরখানেকের মধ্যে সেটি বন্ধ হয়ে যায়। পরে চুয়াডাঙ্গায় তার মামার বাড়িতে আরও একটা খামার করেন। ঢাকা থেকে খামার মেইনটেন করা সম্ভব হয়ে ওঠেনা সুতরাং সেটাও একসময় বন্ধ হয়ে যায়। বারবার বাধার মুখে পরলেও হতোদ্যম হননি। ছুটে গেছেন বিভিন্ন গ্রামে, বিভিন্ন জেলায়। ৩৭টি জেলার কৃষকদের সঙ্গে গড়ে উঠেছে তার শুদ্ধ কৃষি নেটওয়ার্ক। সেসব জেলার খামারিদের কাছ থেকে নিয়মিত কৃষিপণ্য। চলে আসে ঢাকায়। এছাড়া ঢাকার খুব কাছেই কেরানীগঞ্জের রোহিতপুরে নিজেও ১২ বিঘা জমির ওপর একটা খামার গড়ে তুলেছেন কাকলী। এই খামার থেকে নিয়মিত সবজি আসে ‘শুদ্ধ কৃষি’র বিক্রয়কেন্দ্রে।

রাজধানীর গ্রিন রোডে অবস্থিত কমফোর্ট হাসপাতালের অপোজিটে এবং ধানমন্ডি ক্লিনিকের নিচতলায় ‘শুদ্ধ কৃষি’র বিক্রয়কেন্দ্র। দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে আসা প্রাকৃতিক ও জৈব পদ্ধতিতে উৎপাদিত কৃষিপণ্য এখানেই বিক্রি করা হয়। এছাড়া গুকশা ও ধানমন্ডীর ইউনিমার্টে শুদ্ধ কৃষির কর্ণার আছে। সেখান থেকেও ভোক্তারা পণ্য সংগ্রহ করে থাকেন। রাসায়নিক মিশ্রিত ও ভেজাল খাবারের ভিড়ে নিরাপদ খাদ্যের নিশ্চয়তা দিতেই কাকলীর এই উদ্যোগ। শুক্র ও মঙ্গলবার হচ্ছে ‘শুদ্ধ কৃষি’র হাটবার। এই দুই দিন গ্রামের হাটের মতোই এখানে মাছ, মাংস, সবজি, চাল, ডাল থেকে শুরু করে নানারকম কৃষিপণ্য থাকে। শুদ্ধ কৃষির বিক্রয়কেন্দ্রটি খোলা থাকে সপ্তাহের সাতদিনই। উদ্যোগ হিসেবে কৃষিকে বেছে নেয়া নারীর সংখ্যা আমাদের দেশে হাতে গোনা। আবার সেটা যদি হয় অর্গানিক পণ্য তাহলে তো চ্যালেঞ্জ আরো বেশি। কাকলী ঠিক সেই জায়গায় নিজেকে প্রমাণ করতে পেরেছেন যে তিনি সফল।

শহুরে এই কৃষক কাকলি খান বললেন, ভেজালমুক্ত আন্দোলনে ভালোবাসা এবং সততা না থাকলে টেকা দায়। পণ্য নিয়ে বললেন,‘আমার জমির পাশে যে জমি, সেই মালিক খেতে রাসায়নিক সার বা অন্যান্য ক্ষতিকর উপাদান ব্যবহার করছেন। আমি না চাইলেও আমার খেতে তার প্রভাব পড়ছে। তবে অন্যদের তুলনায় শুদ্ধ কৃষির পণ্য অনেক বেশি নিরাপদ, তা দাবি করতে পারি।’

গ্রিন রোডের আউটলেটে ক্রেতা শাহানা আক্তার বললেন, ‘এখান থেকে নিয়মিত কলা কিনি। স্বাদটাই অন্য রকম। ’

শুরুতে বিএ পাস কাকলি খান যেখানেই নিরাপদ খাদ্যের সন্ধান পেয়েছেন, সেখানেই ছুটে গেছেন। মানুষকে বিশ্বাস করে ঠকেছেন বারবার। তবে বর্তমানে একটি নেটওয়ার্ক গড়ে উঠেছে।

কাকলির মতে, ৫০টি পরিবারকেও যদি ভেজালমুক্ত খাবারে অভ্যস্ত করানো যায়, তাও কম না।

এখন অনেকেই কাকলি খানকে ডাকেন ‘শুদ্ধ আপা’। শুরুতে তাঁর পাগলামিতে পরিবারের সদস্যরা বিরক্ত হলেও আস্তে আস্তে স্বামী, ভাই, বাবা, বন্ধুসহ অন্যরাও যুক্ত হন, সহায়তা করেন।

হাসতে হাসতে কাকলি বললেন, ‘বাবার ছিল বিভিন্ন কোম্পানির সারের ডিলারশিপের ব্যবসা। সেই বাবা তাঁর নিজের ব্যবসা বন্ধ করে এখন শুদ্ধ কৃষিতে বসেন।’

কাকলি খানের স্বপ্ন হলো, মোড়ে মোড়ে থাকবে নিরাপদ খাবারের দোকান। ভোক্তা বেশি দাম দিয়ে রেস্টুরেন্টে খাচ্ছেন, দামি জামা কিনছেন, কিন্তু খাবার কিনতে গিয়ে দাম একটু বেশি দেখলেই আর কিনছেন না। তাই ভোক্তাদের মানসিকতায় পরিবর্তন আসা জরুরি বলে বললেন কাকলি খান।

সর্বশেষ

কুষ্টিয়ায় আর্জেন্টিনা-ব্রাজিল সমর্থকদের সংঘর্ষে আহত ৭

কুষ্টিয়া সদর উপজেলায় বিশ্বকাপ ফুটবলের ফাইনাল খেলা নিয়ে বাগ্‌বিতণ্ডার পর সংঘর্ষে জড়িয়ে অন্তত সাতজন...

কুষ্টিয়ায় শিক্ষার্থীকে শ্লীলতাহানি, বরখাস্ত প্রধান শিক্ষককে পুলিশে সোপর্দ

কুষ্টিয়ার কুমারখালীতে পঞ্চম শ্রেণীর এক শিক্ষার্থীকে শ্লীলতাহানির মামলায় বরখাস্ত প্রধান শিক্ষককে বৃহস্পতিবার (১৫ ডিসেম্বর)...

কুষ্টিয়ায় পৃথক সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত ২

কুষ্টিয়ায় পৃথক সড়ক দুর্ঘটনায় একটি শিশুসহ দু’জনের মৃত্যু হয়েছে।   বৃহস্পতিবার (১৫ ডিসেম্বর) দুপুরের দিকে...

পাসপোর্ট সংশোধনে সরকারের নতুন নির্দেশনা

এনআইডির তথ্য অনুযায়ী পাসপোর্ট রি-ইস্যুর নির্দেশ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জাতীয় পরিচয়পত্রে (এনআইডি) দেওয়া তথ্য অনুযায়ী পাসপোর্ট...

আরও পড়ুন

কুষ্টিয়া কুমারখালী | পোড়া কয়লা বিক্রি করে ভাগ্য বদল, মাসে আয় দুই লাখ

জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করা হয় বিভিন্ন গাছের কাঠ। এই কাঠ পুড়েই হয় কয়লা। আর...

কুষ্টিয়ায় ব্যবসায়ীর অতিরিক্ত কৃষি জমি যাচ্ছে সরকারের হাতে

কুষ্টিয়ার দৌলতপুরে নিয়ম বহির্ভূতভাবে কৃষি জমির মালিক থাকায় আইনের আওতায় নেয়া হয়েছে নুরুজ্জামান বিশ্বাস...

কচু চাষে কুষ্টিয়ার কৃষকদের মুখে হাসি

করোনা ভাইরাসের কারণে সবজি চাষিরা চিন্তিত থাকলেও আগাম জাতের কচু চাষ করে ভালো দাম...