Thursday, June 13, 2024

ছোট গল্প- ” অপেক্ষা “

Published on

লেখকঃ হুমায়ূন কবির হিমু,

নাটোরের ছায়াঘন সু-নিবিড় ইউনিয়ন পর্যায়ের নদীতীরের প্রত্যন্ত একটি গ্রামের নাম শফিপুর। জেলা সদর থেকে গ্রামটির দুরত্ব ৩০ কিলোমিটারের বেশি হবে। জেলা সদর থেকে গ্রামটিতে যেতে হলে বাসে চড়ে প্রথমে নামতে হবে ইসলামপুর বাসষ্ঠ্যান্ডে। তারপর ইঞ্জিন চালিত নছিমন, করিমন, আলগামন, আলম-সাধু অথবা ছই বা টাপা ছাড়া (আলগা) ভ্যানে চড়ে গ্রামে যেতে হয়। এক সময় গ্রামটিতে কোন পাকা রাস্তা ছিলো না। কালের বিবর্তনে এই গ্রামটিসহ আশপাশের গ্রামেও পাকা সড়ক নির্মান হয়েছে।

এই গ্রামেরই মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান গ্রাজুয়েট ডিগ্রীধারী সাজেদুল করীম ওরফে সাজু। মাধ্যমিক স্কুলে পড়ার সময় মামা পেশাদার চিত্রশিল্পী হবার কারনে সাজুর সম্পর্ক তৈরী হয় রং আর তুলির সাথে। এক সময় রং আর তুলির প্রতি ভীষণ দুর্বল হয়ে পড়ে সাজু। লেখা-পড়া শিকেই ওঠার উপক্রম হয়। ধীরে ধীরে সাজুর শখের রং আর তুলির নেশাটি তাকে এমন একটি পর্যায়ে নিয়ে যায় যে এক সময় পেশাদার আর্টিষ্ট হবার স্বপ্ন দেখতে শুরু করে সে।

লেখা-পড়া ফাঁকি দিয়ে সে মাঝে মাঝেই উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ের বিভিন্ন দোকানের সাইন বোর্ড ও বিভিন্ন উৎসব/অনুষ্ঠানের ব্যানার লেখা এমনকি বিয়ে বাড়ীতে আলপনা আকার জন্যও সাজুর আমন্ত্রন আসতে থাকে। বাবা-মা সাজুর লেখাপড়ার চেয়ে আর্টের প্রতি বেশি ঝোক দেখে বিচলিত হয়ে পড়ে।

এরই মধ্যে সাজুর এসএসসি পরীক্ষা দেবার সময় চলে আসে। ছোটবেলা থেকেই মেধাবী হবার কারণে অল্প লেখাপড়া করেও এসএসসিতে মোটামুটি মানের রেজাল্ট করে পাশ করে। আর্টের প্রতি প্রবল নেশা আর বাবা-মায়ের অনাগ্রহ একসাথে দুটি বিষয়কে মানিয়ে চলা দারুন দুরুহ হয়ে পড়ে সাজুর। তাই এসএসসি পাশ করে তারই ইউনিয়নের পাশ্ববর্তী আরেকটি ইউনিয়নের আসমানপুর ডিগ্রী কলেজে এই্চএসসিতে ভর্তি হয়।

লেখাপড়া যাইহোক না কেন পেশাদার আর্ট’র কাজটি যাতে সে নির্বিগ্নে করতে পারে তার জন্য কলেজ থেকে সাজুর বাড়ীর দুরত্ব মাত্র ৪/৫ কিলোমিটার দুরের পথ হওয়া সত্বেও সে কলেজের হোষ্টেলে এসে ওঠে। লেখাপড়া আর আর্ট দুটোই চলতে থাকে সাজুর। অল্পদিনেই হোষ্টেলের র“মটিকে সাজু আর্ট গ্যলারী বানিয়ে ফেলে। এরই মধ্যে সাংবাদিকতা করার নতুন ঝোক তৈরী হয় তার। লেখাপড়া, আর্টের কাজ পাশাপাশি নাটোরের স্থানীয় পত্রিকায় লেখালেখি শুরু করে। অল্পদিনেই আর্টিষ্ট সাজুর নামের পাশে সাংবাদিক পরিচয় যুক্ত হয়। কলেজজুড়ে সাজুর নামডাক ছড়িয়ে পড়ে।

একদিন দুপুরে হোষ্টেলে নিজের রুমে আর্টের কাজ করার সময় হোষ্টেলের পাশের কয়েকশত গজ দুরের বাসিন্দা উচ্চবিত্ত পরিবারের বাবা-মায়ের একমাত্র সন্তান রাত্রী সাজুর সাথে দেখা করতে আসে। গ্রাম্য মেয়েরা সাধারনত যে ধরনের পোশাক-আশাক পরে থাকে গ্রাম্য মেয়ে হওয়া সত্বেও রাত্রীর পরিধেয় পোশাক ছিলো তার বিপরীত।

রাত্রীকে দেখতে এককথায় অনিন্দ্য সুন্দরী বলা না গেলেও সে দেখতে বেশ সুন্দরী। তারউপর বাবা-মায়ের একমাত্র আদরের সন্তান হওয়ায় প্রায় সময়ই ছেলেদের মতো প্যান্ট-শার্ট পরে আলট্রা মডার্ন হাই হ্যালো ধরনের চলাচল করতো সে। উঠতি বয়সী যুবকদের কাছে রাত্রী ছিল স্বপ্নের রাণী। অনেক রোমিয়ই সে সময় রাত্রীর সাথে প্রেম নিবেদন করার জন্য তার পিছু পিছু মাসের পর মাস ঘুর ঘুর করতো। তা সত্বেও আর্ট ও সাংবাদিকতার প্রতি দুর্বল হয়ে সাজুর প্রেমে পড়ে যায় রাত্রী। ওই দিন রাতেই রাত্রী মুঠোফোনে সাজুকে তার আর্ট এবং সাংবাদিকতা বিষয়ের প্রশংসা করে।

এরপর দিন নেই, রাত নেই, মাঝে মাঝেই রাত্রী ও সাজুর মুঠোফোনে বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলাপ হতো। এক পর্যায়ে রাত্রী প্রথম জানায় সাজুকে তার ভালোলাগার কথা। সাজুও রাত্রীকে ভালোলাগার কথা জানায়। ভালোলাগা থেকে ভালোবাসা। দিন যতই গড়াতে থাকে ক্রমেই সাজু ও রাত্রীর দুরত্ব কমে এসে তারা ভালবেশে একে অপরকে সাথে নিয়ে ঘরবাঁধার স্বপ্ন দেখতে শুরু করে। চুপি চুপি ভালোবাসার বিষয়টি রাত্রীর পরিবার জেনে যায়। সাজুর চেয়ে রাত্রীর আর্থিক অবস্থা ঢের বেশী ভালো হওয়ায় রাত্রীর পরিবার বাঁধ সাধে।

রাত্রীকে সাজুর কাছ থেকে দুরে সরিয়ে রাখতে বিভিন্ন ফন্দি-ফিকির শুর“ করে রাত্রীর পরিবার। তা সত্বেও রাত্রীর অবুঝমনকে কোনভাবেই সাজুর ভালোবাসা থেকে দুরে রাখতে পারেনি। রাত্রীর কথামতো একদিন প্রকাশ্য দিবালোকে সাজু তাঁর কয়েকজন বন্ধুকে মাইক্রোবাসে করে এসে রাত্রীর বাড়ী থেকে উঠিয়ে নিয়ে গিয়ে কোর্টের মাধ্যমে বিয়ে করে। রাত্রীর পরিবার সাজুর নামে মামলা করার জন্য এজাহার লিখে এনে থানায় জমা দেয়।

কিন্ত অজ্ঞাতস্থান থেকে রাত্রী তার বাবা-মাকে মুঠোফোনে সাফ জানিয়ে দেয় আমি প্রাপ্তবয়স্কা, স্বইচ্ছায় সাজুকে ভালোবেশে ইসলামী শরিয়া অনুযায়ী বিয়ে করেছি। তারপর থানায় আর মামলা হয়নি। প্রেম করে বিয়ে। প্রেমের অধ্যায় শেষে সাজু ও রাত্রীর সংসার জীবনের শুর“। বাস্তবতার মুখোমুখি তারা। সাজু বেকার যুবক। ইচ্ছার বিরুদ্ধে বিয়ে করার অপরাধে রাত্রীর পরিবার রাত্রীকে ত্যাজ্যকন্যা করার সিদ্ধান্ত নেয়। সাজুর পরিবারও পরিবারের ইচ্ছার বিরুদ্ধে প্রেম করে বিয়ে করায় একরকম বাড়ী থেকে টাকা পয়সা পাঠানো বন্ধ করে দেয়। লোকাল প্রতিনিধি হিসাবে কাজ করলেও সাজুর লেখার হাত মেধাসমৃদ্ধ হওয়ায় পত্রিকা অফিস সাজুকে যথেষ্ট সমীহ করতো।

প্রেম করে বিয়ে এবং এলাকা ছাড়া হওয়ায় সাজুকে নাটোরের দৈনিক ভবের হাট নামের একটি পত্রিকায় নামমাত্র বেতনে বার্তা সম্পাদক হিসাবে কাজ করার প্রস্তাব দিলে সাজু সেখানে যোগ দেয়। জেলা শহরেই স্বল্প টাকা বেতনে বাসাভাড়া নিয়ে তারা সংসার শুরু করে। অভাব যখন ঘরের দুয়ারে আসে ভালোবাসা তখন ঘরের জানালা দিয়ে পালায়। অল্পদিনেই গুনীজনদের এই প্রবাদবাক্য যেন সাজু ও রাত্রীর সংসাবে বাস্তব হয়ে দেখা দেয়।

ভালোবাসা অটুট থাকলেও কোনভাবেই সাজু ও রাত্রীর সংসারে স্বচ্ছলতা আসছিল না। দিন দিনই তারা অভাবের জালে জড়িয়ে যাচ্ছিল। এক পর্যায়ে অভাবের কাছে পরাজিত হয় রাত্রী ও সাজুর ভালোবাসা। দীর্ঘদিনের ভালোবাসাকে পায়ে ডলে ভালোবাসার মানুষ জীবন সঙ্গী সাজুকে ছেড়ে পিতার বাড়ীতে ফিরে আসে রাত্রী।

পিতার বাড়ীতে এসে রাত্রী পিতার মুক্তিযোদ্ধা কোঠার সার্টিফিকেট দিয়ে প্রাথমিক শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে গত গ্রায় ২ বছর ধরে শিক্ষকতা করছে। অন্যদিকে সাজুও রাত্রী তার কাছ থেকে অভাবের কারণে চলে যাবার পর থেকে অভাব ঘোচাতে নিরন্তর বিভিন্ন কর্মযজ্ঞ চালিয়ে এখন সে লাখপতি। এখন সাজু ও রাত্রী কেউই অভাবী নয়। শুধু তাদের কাছ থেকে পালিয়ে গেছে ভালোবাসা। কেউই এখনো অন্যত্র বিয়ে করেনি।

সাজুর ঘর ছেড়ে রাত্রী বাবার বাড়ীতে ফিরে আসার পর সাজু রাত্রীর বান্ধবী ও কাছের আত্বীয় স্বজনদের মাধ্যমে এবং রাত্রী সাজুর কাছের মানুষদের কাছে কেমন আছে মাঝে মাঝে জানার চেষ্টা করে। কিন্তু সাজু ও সাজু রাত্রী একটি বারের জন্যও পরস্পরকে ফোন করেনি । সাজু চায় আগে ফোন কর“ক রাত্রী, আর রাত্রী চায় সাজু করুক। সাজু ও রাত্রীর না বলা কথার পাহাড় জমে হৃদয়ে রক্তক্ষরণ হচেছ অনবরত।

এরই মাঝে কেটে গেছে ৭ বছরের বেশি সময়। অভিমান ভেঙ্গে কেউ কারো সঙ্গে এখনো কথা বলেনি।

সর্বশেষ

কুষ্টিয়ায় আর্জেন্টিনা-ব্রাজিল সমর্থকদের সংঘর্ষে আহত ৭

কুষ্টিয়া সদর উপজেলায় বিশ্বকাপ ফুটবলের ফাইনাল খেলা নিয়ে বাগ্‌বিতণ্ডার পর সংঘর্ষে জড়িয়ে অন্তত সাতজন...

কুষ্টিয়ায় শিক্ষার্থীকে শ্লীলতাহানি, বরখাস্ত প্রধান শিক্ষককে পুলিশে সোপর্দ

কুষ্টিয়ার কুমারখালীতে পঞ্চম শ্রেণীর এক শিক্ষার্থীকে শ্লীলতাহানির মামলায় বরখাস্ত প্রধান শিক্ষককে বৃহস্পতিবার (১৫ ডিসেম্বর)...

কুষ্টিয়ায় পৃথক সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত ২

কুষ্টিয়ায় পৃথক সড়ক দুর্ঘটনায় একটি শিশুসহ দু’জনের মৃত্যু হয়েছে।   বৃহস্পতিবার (১৫ ডিসেম্বর) দুপুরের দিকে...

পাসপোর্ট সংশোধনে সরকারের নতুন নির্দেশনা

এনআইডির তথ্য অনুযায়ী পাসপোর্ট রি-ইস্যুর নির্দেশ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জাতীয় পরিচয়পত্রে (এনআইডি) দেওয়া তথ্য অনুযায়ী পাসপোর্ট...

আরও পড়ুন

থ্রিলার গল্পঃ “কালোছায়া” পর্ব-৬

লেখকঃ "এম এইচ নীলয়" পর্ব-৬ ( শেষপর্ব ) শুভনের চোখ খুশিতে চিক করে উঠলো, অার নিজেও...

থ্রিলার গল্পঃ “কালোছায়া” পর্ব-৫

লেখকঃ "এম এইচ নীলয়" পর্ব-৫ "স্যার'' শায়লা বেগমের বড় মেয়ে অানিকা, গত রাতে সিলিং ফ্যানের সাথে...

থ্রিলার গল্পঃ “কালোছায়া” পর্ব-৪

লেখকঃ "এম এইচ নীলয়" পর্ব-৪ -- ম্যাডাম, অাপনার মেয়েদের কি কখনো জিজ্ঞেস Or খোঁজ নিয়েছেন "ওরাও...