Thursday, July 18, 2024
প্রচ্ছদকুষ্টিয়ামিরপুরকুষ্টিয়ার একজন শরবত মনিরের গল্প

কুষ্টিয়ার একজন শরবত মনিরের গল্প

Published on

ব্যাপক পুঁজি না থাকলেও লক্ষ্য স্থীর করে সততা মেধা আর পরিশ্রমের সমন্বয় ঘটিয়ে যে ব্যবসায়ে সাফল্য অর্জন করা সম্ভব তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ কুষ্টিয়া মিরপুর তহ বাজার সংলগ্ন মুদি ও ক্রোকারেজ বিক্রেতা মনিরুল ইসলাম মনির(৩০)।

প্রায় একযুগ ব্যবসার সাথে জড়িত মনির গত ৮ বছর যাবৎ ক্রেতা সাধারনের চাহিদার কথা বিবেচনা করে তার ব্যবসায়ে শরবত আইটেম যুক্ত করে ইতিমধ্যেই ব্যাপক সাড়া ফেলেছে। শীতের সারা, গরমের শুরু। এরই মধ্যে ‘মনিরের’ শরবত বিক্রি শুরু হয়েছে। যত গরম ততই বাড়ে মনিরের শরবতের চাহিদা। এ এলাকার মানুষ যখন প্রচন্ড গরমে অতিষ্ঠ হয়ে ওঠে তখন মনিরের দোকানে আসে এক গ্লাস শরবত পান করে প্রান জুড়াতে। অথচ কেউ কেউ জানলেও অনেকেই জানেনা আজকের সফল শরবত বিক্রেতা ‘মনির’ কতটা কষ্টের পথ পাড়ি দিয়ে আজকের এই জায়গায় এসেছে।

বয়স তখন ৬-৭ বছর। শিশু মনিরের সমবয়সিরা যখন বই-খাতা হাতে নিয়ে পড়া-লেখা শেখার জন্য স্কুলে যাওয়া শুরু করেছে, তখন মনিরের ঘাড়ে বর্তায় সংসারের দারিদ্র ঘোচানোর দায়। সমবয়সীরা বই-খাতা হাতে নিয়ে স্কুলে যায় আর তখন শিশু মনিরকে যেতে হয় বুকে সেপটিপিন লাগিয়ে পলিথিনের ব্যাগ বিক্রি করতে হাটে-বাজারে। সারাদিন খেয়ে না খেয়ে পলিথিন ব্যাগ বিক্রি করে যা আয় হয় তার পুরোটাই এনে মায়ের হাতে তুলে দিত। এই সময় মনিরের অবিবেচক নিষ্ঠুর পিতা তার মাকে ডিভোর্স প্রদান করেন। কিছুদিন পর মায়ের অন্যত্র বিয়ে হলে সংসারের অভাব ঘোচাতে মনিরের মা, সৎ পিতা ও মনির যৌথভাবে (আমদানি নিষিদ্ধ ভারতীয় পন্যে) ব­াকের ব্যবসা শুরু করে। তাতেও সংসারের অভাব দুর না হওয়ায় মিরপুর বাজারের ছানোয়ারের চায়ের দোকানের কর্মচারী, মিরপুর বাসষ্ট্যান্ড বাজারে হান্নান ও নজরুলের হোটেলে হোটেল বয় হিসাবে কাজ করে।

এরপর মিরপুর বাসষ্ট্যান্ড বাজারেই খায়রুল ও বাবলুর শাপলা হার্ডওয়ারের দোকানে কাজ নেয়। দিনে এই হার্ডওয়ারের দোকানে কাজ করে আর রাতে নিরক্ষর থেকে অক্ষরজ্ঞান অর্জনের জন্য সাংবাদিক হাজী আছাদুর রহমান বাবুর পরিচালিত গনশিক্ষা পাঠাগারে নাইট শিফটে লেখা পড়া শুরু করে। গনশিক্ষা পাঠাগারে মাত্র ৪-৫ দিন ক্লাস করে শুধু বর্ণমালা শিখেছে। পরবর্তীতে মনির একা একাই নিজের প্রচেষ্টায় নাম লেখা শেখা থেকে শুরু করে এখন শুধু বাংলাই নয় ইংরেজীর অনেক বিষয় মনির এখন পড়তে ও লিখতে পারে। হার্ডওয়ারের দোকানে কর্মচারী থেকেও ভাগ্যের পরিবর্তন না হওয়ায় মিরপুর গ্রামের সাইকেল মেকার জহুরুলের কাছে সাইকেল মেকারী শেখা শুরু করে।

এরপর মাত্র ২০০০ টাকা পুঁজি নিয়ে মিরপুর বাসষ্ট্যান্ড বাজারে পান বিড়ির দোকান দেয়। এলাকার লোকজন দোকানে বাঁকী খেয়ে সময়মত পয়সা না দেয়ায় ও দুই হাজার টাকা পুজি লোকসান খেয়ে মাত্র ৫০০ টাকায় নেমে আসে। সেখান থেকে মিরপুর ঈগল চত্বর বাজারে এসে হুমা চৌধুরীর সেবা ফার্মেসীর পাশে ও আমজাদ বিশ্বাসের বিশ্বাস হার্ডওয়ারের পাশে পানবিড়ির ভ্রাম্যমান দোকান দিয়ে ব্যবসা শুরু করে। এক পর্যায়ে কাঠমিস্ত্রি আলীর সহযোগীতায় হুমা চৌধুরীর বাড়ীর গেটে পানবিড়ির দোকান দেয়ার পর থেকে সফলতার মুখ দেখা শুরু করে মনির।

এরপর সেখান থেকে মিরপুর ঈগল চত্বর বাজারের জিকে ব্রীজের দক্ষিণপার্শ্বে ফজু বিশ্বাসের দোকান ভাড়া নিয়ে পানবিড়ির পাশাপাশি ডিম বিক্রি শুরু করে। আর এই ডিম বিক্রি করতে গিয়েই উপজেলার বারুইপাড়া ইউনিয়নের ছত্রগাছা গ্রামের পোল্ট্রি ফার্মের মালিক শাহিনের সাথে পরিচয় ঘটে মনিরের। শাহিন প্রথমে মনিরকে বাঁকীতে ১/২ খাচি ডিম দেয়া শুরু করে। সময়মত বাঁকী পরিশোধ করা ও বিনয়ী স্বভাবের কারনে অল্পদিনেই মনির শাহীনের আস্থাভাজন হয়ে পড়ে। সেখান থেকেই মনিরের ডিম বিক্রির উত্থান শুরু। আজ মনিরের দোকানে প্রতিদিন গড়ে ১০০ খাচির উপর ডিম বিক্রি হচ্ছে। সাথে মুদি, ক্রোকারেজ ও শরবত বিক্রি থেকে প্রতিদিন মনিরের দোকানে ২০ হাজার টাকা থেকে ৩০ হাজার টাকা পর্যন্ত বিক্রি হয়। খরচ বাদে প্রতিদিন তার নিট লাভ ৭০০ টাকা থেকে ১০০০ টাকা পর্যন্ত। মনির পৌরসভার ৬ নং ওয়ার্ডের মকবুল হোসেনের ছেলে। বর্তমানে সে ক্রোকারেজ ও মুদি ব্যবসা করে স্বালম্বী। দোকানে প্রচুর পরিমানে ডিম বিক্রি হওয়ায় এক সময় মনিরকে ক্রেতারা চিনত ‘ডিম মনির’ নামে। গত ৭/৮ বছর ব্যবসার সাথে শরবত আইটেম যুক্ত করায় এবং ক্রেতাসাধারনের কাছে শরবতের কদর বাড়ায় ‘ডিম মনির’কে এখন বেশি চেনে ‘শরবত মনির’ হিসাবে।

আলাপকালে মনির জানায়, বেল, ইসুবগুল, লেবু, তুকমাদানা, পেসতাদানা, পেসতা বাদাম, তালমাখানা, হালিমদানা, কাজু বাদাম, কমলা রস ও আঙ্গুরের রস দিয়ে সে গত ৭/৮ বছর যাবৎ শরবত বানিয়ে ফ্রিজজাত করে বিক্রি করছে। প্রথম দিকে অল্পবিস্তর বিক্রি হলেও এখন তার শরবতের ব্যপক চাহিদা তৈরী হয়েছে। গরম সীজনে সে একদিনে সর্বচ্চ ৫০০ গ্লাস পর্যন্ত শরবত বিক্রি করেছে। প্রচন্ড গরমে মানুষ যখন অতিষ্ঠ হয়ে পড়ে তখন মিরপুর এলাকা ছাড়াও দুর-দুরান্ত থেকেও মানুষ আসে মনিরের শরবত পান করতে। টাকার অভাবে নিজে লেখাপড়া শিখতে না পারার কষ্টটা এখনো মনিরকে মাঝে মাঝে ভীষণভাবে তাড়া করে। তাই মনিরের ইচ্ছা আছে ৩ কন্যা সন্তানকে উচ্চ শিক্ষিত করার।

সর্বশেষ

কুষ্টিয়ায় আর্জেন্টিনা-ব্রাজিল সমর্থকদের সংঘর্ষে আহত ৭

কুষ্টিয়া সদর উপজেলায় বিশ্বকাপ ফুটবলের ফাইনাল খেলা নিয়ে বাগ্‌বিতণ্ডার পর সংঘর্ষে জড়িয়ে অন্তত সাতজন...

কুষ্টিয়ায় শিক্ষার্থীকে শ্লীলতাহানি, বরখাস্ত প্রধান শিক্ষককে পুলিশে সোপর্দ

কুষ্টিয়ার কুমারখালীতে পঞ্চম শ্রেণীর এক শিক্ষার্থীকে শ্লীলতাহানির মামলায় বরখাস্ত প্রধান শিক্ষককে বৃহস্পতিবার (১৫ ডিসেম্বর)...

কুষ্টিয়ায় পৃথক সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত ২

কুষ্টিয়ায় পৃথক সড়ক দুর্ঘটনায় একটি শিশুসহ দু’জনের মৃত্যু হয়েছে।   বৃহস্পতিবার (১৫ ডিসেম্বর) দুপুরের দিকে...

পাসপোর্ট সংশোধনে সরকারের নতুন নির্দেশনা

এনআইডির তথ্য অনুযায়ী পাসপোর্ট রি-ইস্যুর নির্দেশ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জাতীয় পরিচয়পত্রে (এনআইডি) দেওয়া তথ্য অনুযায়ী পাসপোর্ট...

আরও পড়ুন

টিউশনি করে গোল্ডেন এ প্লাস পেলেন কুষ্টিয়ার জমজ দুই বোন

সংসারের একমাত্র উপার্জনক্ষম বাবা দীর্ঘদিন ধরে মানসিক রোগী। টিউশনি করে কোন রকমে সংসার চালাচ্ছেন...

ভারতীয় সিরিয়াল ‘সিআইডি’ দেখে কুষ্টিয়ার ফুল ব্যবসায়ী আবু তৈয়ব হত্যার পরিকল্পনা

কুষ্টিয়ার মিরপুরে ফুল ব্যবসায়ী আবু তৈয়ব (৫৪) হত্যার পর দ্রুততার সাথে রহস্য উদঘাটন করেছে...

কুষ্টিয়ার মিরপুরে র‌্যাবের অভিযানে ইয়াবাসহ আটক ২

কুষ্টিয়ার মিরপুরের কাতলামারী বাজার থেকে ইয়াবাসহ টুটুল হোসেন (২২) ও তৌফিক রানা সিয়াম (২০)...