Friday, December 9, 2022
প্রচ্ছদকৃষিঈদকে সামনে রেখে কুষ্টিয়ার ৪০ হাজার গরু কিনে নিয়েছে সিন্ডিকেট

ঈদকে সামনে রেখে কুষ্টিয়ার ৪০ হাজার গরু কিনে নিয়েছে সিন্ডিকেট

Published on

কোরবানির ঈদকে সামনে রেখে সক্রিয় হয়ে উঠেছে শক্তিশালী সিন্ডিকেট চক্র। ঈদের দেড়মাস বাঁকি থাকলেও ওই চক্রের কব্জায় চলে গেছে কুষ্টিয়ার প্রায় ৪০ হাজার পশু। গত একমাসে জেলার হাট-বাজার ও প্রত্যন্ত অঞ্চলের বাড়ি বাড়ি গিয়ে সিন্ডিকেটের নিয়োগ করা ব্যাপারীরা এসব গরু-ছাগল ক্রয় করেছেন বলে জানিয়েছে স্থানীয় খামারি ও কৃষকরা। এবার কম পশু উত্পাদনের সুযোগ নিয়ে আগেভাগেই মাঠে নেমে বিপুল পরিমান এই পশু নিজেদের কব্জায় নিয়েছে সিন্ডিকেট।

প্রতি বছর কোরবানির ঈদে দেশের বাজারে পশুর চাহিদা মেটাতে সবচেয়ে বেশি ভূমিকা রাখে কুষ্টিয়া অঞ্চলের খামারি ও কৃষকরা। এবারও জেলার ২০ হাজার ১১০জন গো-খামারি ও কৃষক এক লাখের বেশি পশু উৎপাদন করেছেন। তবে অধিকাংশ পশু সিন্ডিকেটের হাতে চলে যাওয়ায় ঈদে পশু সংকট হতে পারে বলে আশংকা করছেন কৃষকরা।

সুত্রে জানা গেছে, এ বছর কুষ্টিয়া অঞ্চলে পশু উৎপাদন প্রায় অর্ধেকে নেমে এসেছে। এই সুযোগকে কাজে লাগতে আগেভাবে মাঠে নেমেছে রাজধানী ঢাকা ও চট্রগ্রামের ১০ থেকে ১৫ জনের একটি সিন্ডিকেট চক্র। ওই চক্রের নিয়োগ করা ব্যাপারীরা গত একমাস ধরে জেলার হাট-বাজার ও প্রত্যন্ত অঞ্চলের বাড়ি বাড়ি ঘুরে বিপুল পরিমান গরু-ছাগল কিনে নিয়েছেন। ইতিমধ্যে জেলার প্রায় ৪০ হাজার পশু চলে গেছে সিন্ডিকেটের কব্জায়। তারা এই বিপুল পরিমান পশু ক্রয় করে ঢাকায় নিয়ে মজুদ করেছেন বলে জানান স্থানীয় ব্যাপারীরা।

স্থানীয় কৃষকরা জানান, জেলার সবচেয়ে বেশি গরু উৎপাদন হয় দহকুলা, ঝাউদিয়া ও বাঁশগ্রামে। এই সব গ্রামে এখন বড় মাপের কোন গরু নেই। বেছে বেছে সব গরু চড়া দামে নিয়ে গেছেন বাইরের ব্যাপারীরা। ছোট ছোট কিছু গরু থাকলেও বিক্রি হচ্ছে বেশি দামে। একদিকে কম উৎপাদন, অন্যদিকে সিন্ডিকেটের থাবায় ঈদের দেড়মাস আগেই বেড়ে গেছে সব ধরনের পশুর দাম।

জেলার সবচেয়ে বড় খামারী কাজী ফার্ম’র কাজী শওকত জানান, কৃষকের হাতে কোন গরু নাই। অনেক গ্রামের গরুই জেলার বাইরে চলে গেছে। বিভিন্ন জেলা থেকে গরু ক্রয় করে ঢাকায় স্টক হচ্ছে। এবার পুরো সিন্ডিকেটের হাতে চলে গেছে দেশের গরু বাজার।

বাঁশগ্রাম এলাকার কৃষক আশরাফুল ইসলাম আশা বলেন, জেলার সবচেয়ে বেশি গরু উৎপাদন হয় বাঁশগ্রামে। গত কয়েকদিন এখানে প্রচুর গরু কেনা-বেচা হয়েছে। বাইরে থেকে ব্যাপারী এসে গরু কিনে নিয়ে গেছে। বর্তমানে এলাকায় গরুর সংখ্যা খুবই কম।

ভাদালিয়া এলাকার ব্যাপারী শাজাহান আলী বলেন, বড় মানের সব গরুই বিক্রি হয়ে গেছে। বাইরের লোকজন এসে গরু কিনে নিয়েছে। এখন যেসব গরু আছে সেগুলো অনেক বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে। তিনি জানান, তিন-সাড়ে তিন মনের একটি গরু ৬০ থেকে ৭০ হাজার এবং ৪ থেকে ৫ মন ওজনের গরু ৮০ থেকে ৯০ হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে।

এদিকে, কৃষকের তথ্যের সাথে মিল নেই জেলা পশু সম্পদ অফিসের হিসাব। সরকারী হিসেবে এবার জেলায় মাত্র ১৩৮৭ পশু কম উৎপাদন হয়েছে। জেলা পশু সম্পদ অফিসের এই তথ্যের সাথে দ্বিমত পোষণ করে কৃষক ও খামারিরা। তারা বলছেন এবার ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ পশু কম উৎপাদন করেছেন। গত বছর জেলা পশু সম্পদ অফিসের হিসেবে উৎপাদন হয়েছিল এক লাখ ৫৮ হাজার পশু। এবছর সেই হিসাব থেকে কিছুটা কমে উৎপাদন দঁড়িয়েছে এক লাখ ৫৬ হাজার ৬১৩।

কুষ্টিয়া জেলা পশু সম্পদ অফিস সূত্রে জানা গেছে-এবার জেলার ৬টি উপজেলায় ২০হাজার ১১০টি খামার রয়েছে। এর মধ্য গরু ৮০ হাজার ১৩৯, ছাগল ৬৪ হাজার ১৮২ এবং ভেড়া ৩ হাজার ১২১। সবেচেয়ে বেশি খামার এবং পশু বেশি কুষ্টিয়া সদর উপজেলায়। সদর উপজেলায় সরকারী মতে ৪৪৮৩টি খামার, গরুর পরিমান ১২ হাজার ৩৮৭টি, দৌলতপুর উপজেলায় ৪৪৪০টি খামার, গরু রয়েছে ১৩ হাজার ৯০৭, কুমারখালী উপজেলায় ৪০৯৪ টি খামার, গরুর সংখ্যা ১১ হাজার ৬৯৮টি, খোকসা উপজেলায় ৩১২৯টি খামার, গরু রয়েছে ৮হাজার ৮৭টি, মিরপুর উপজেলায় ২৯৭২টি খামার, গরু রয়েছে ১৩ হাজার ৯৮০টি এবং ভেড়ামারা উপজেলায় ৯৯২টি খামার, যার গরুর পরিমান ২হাজার ৪৫৯টি।

কুষ্টিয়া সদর উপজেলার বটতৈল এলাকার কৃষক সলিম হোসেন জানান, গত বছর তিনটি গরুতে প্রায় বিশ হাজার টাকা লস (ক্ষতি) হয়েছে। গরু তিনটি উৎপাদনে প্রায় ১ লাখ ৭০ হাজার টাকা খরচ হলেও বিক্রি করতে হয়েছে দেড় লাখ টাকায়। গত ঈদের শেষ মূহুত্বে গরুর দাম কমে যাওয়ায় এই লস গুণতে হয়। তিনি বলেন, গরু উৎপাদন করে লাভতো দূরের কথা প্রতি বছরই লস হচ্ছে। তাই এবছর কোন গরু উৎপাদন করেনি।

একই অভিযোগ উজান গ্রামের কৃষক রজব মন্ডলের। তিনি জানান, বর্তমানে একটি গরু উৎপাদন করতে যে খচর হচ্ছে, বিক্রি করলে সেই টাকা উঠানো যাচ্ছে না। কয়েক বছরে গরুর সব খাবারের দাম দ্বিগুণ হলেও গরুর দাম বাড়েনি। তাই এবার তার বাড়িতে কোন গরু নেই। সলিম হোসেন ও রজব মন্ডলের মতো অধিকাংশ খামারি ও কৃষকরা জানান, গত বছরের থেকে এবার পশু উৎপাদন অনেক কম হয়েছে।

সরেজমিনে গিয়ে জানা যায়, সরকারী হিসেবের থেকে এবার কোরবানির পশুর সংখ্যা অনেক কম। প্রতি বছর এলাকার গ্রামেগঞ্জে প্রায় সব বাড়িতেই ২/৪টি কোরবানীর গরু পাওয়া যেত। তবে এবারের চিত্র ভিন্ন। অনেক বাড়িতে দেখা গেছে গরু-ছাগলের চাষ নেই। আবার যেসব বাড়িতে পশু আছে, সেখানে সংখ্যায় অনেক কম।

খামারী কাজী ফার্ম’র কাজী শওকত জানান, গত ঈদে তার খামারে পশু ছিল ১৮০টি। এবার উৎপাদন কমে পশু সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৪০টি। এরমধ্যে ৬টি সাদা মহিষ এবং ৪০টির মত ছোট ভুটানি গরু রয়েছে। বাঁকি সব দেশি গরু।

কুষ্টিয়া জেলা পশু সম্পদ কর্মকর্তা ডাঃ মোঃ সিদ্দীকুর রহমান জানান, কোরবানির ঈদকে সামনে রেখে প্রতিটি উপজেলায় আমাদের কর্মীরা কাজ করছে। উপজেলা প্রাণি সম্পদ কর্মকর্তার নেতৃত্বে প্রতি উপজেলায় মেডিকেল টিম গঠন করা হয়েছে। উপজেলার গুরুত্বপূর্ণ দুইটি হাটে এই মেডিকেল টিম কাজ করবে। পশুর রোগ প্রতিশোধক ভ্যাকসিন পর্যাপ্ত রয়েছে। খামারি এবং কৃষকদের মাঝে চাহিদামত তা ব্যবহার করা হবে।

তিনি আরো জানান- কুষ্টিয়াতে এখন গরু মোটাজাতাকরণ ট্যাবলেট ব্যবহার করা হয় না। আমরা গ্রামের প্রত্যন্ত মানুষকে উদ্বুদ্ধকরনে সারা বছর প্রশিক্ষন দিয়ে যাচ্ছি। সচেতনতা সৃষ্টির জন্য বিভিন্ন প্রচার প্রচারনা ও লিফলেট বিলি করে আসছি। চাষীদেরকে আমরা বুঝাতে সক্ষম হয়েছি।

সর্বশেষ

কুষ্টিয়ায় মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায় ঝরে গেল ২ প্রাণ

কুষ্টিয়া ভেড়ামারা উপজেলায় ট্রাকের চাপায় মোটরসাইকেল চালকসহ দুইজন নিহত হয়েছেন। শনিবার (৩ ডিসেম্বর) সকাল সাড়ে...

ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে পাইলিংয়ের সময় ক্রেন ছিড়ে নির্মাণ শ্রমিকের মৃত্যু

ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে (ইবি) নির্মাণাধীন দ্বিতীয় প্রশাসন ভবনের পাশে পাইলিংয়ের সময় মাথার আঘাত পেয়ে দুর্ঘটনাবশত...

এসএসসি পরীক্ষায় যশোর বোর্ডে প্রথম হলেন কুষ্টিয়ার শিক্ষার্থী নাজিফা

এ বছর মাধ্যমিক পরীক্ষায় যশোর বোর্ডে প্রথম হয়েছে কুষ্টিয়া সরকারি বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী নাজিফা...

টিউশনি করে গোল্ডেন এ প্লাস পেলেন কুষ্টিয়ার জমজ দুই বোন

সংসারের একমাত্র উপার্জনক্ষম বাবা দীর্ঘদিন ধরে মানসিক রোগী। টিউশনি করে কোন রকমে সংসার চালাচ্ছেন...

আরও পড়ুন

কুষ্টিয়ায় ব্যবসায়ীর অতিরিক্ত কৃষি জমি যাচ্ছে সরকারের হাতে

কুষ্টিয়ার দৌলতপুরে নিয়ম বহির্ভূতভাবে কৃষি জমির মালিক থাকায় আইনের আওতায় নেয়া হয়েছে নুরুজ্জামান বিশ্বাস...

কচু চাষে কুষ্টিয়ার কৃষকদের মুখে হাসি

করোনা ভাইরাসের কারণে সবজি চাষিরা চিন্তিত থাকলেও আগাম জাতের কচু চাষ করে ভালো দাম...

কুষ্টিয়ার চরাঞ্চলে বাদাম চাষে সাফল্য পেলেও ফলন নিয়ে হতাশা চাষীদের

অনাবাদি পদ্মা চরে চিনা বাদাম চাষ করে সাফল্য পেয়েছেন কুষ্টিয়ার দৌলতপুরের চাষীরা। তবে প্রকৃতির...